কওমি মাদ্রাসা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এবং দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ ও মূলনীতির ওপর পরিচালিত হয় এবং এখানে ইলমে ওহীর বিশুদ্ধ জ্ঞান চর্চা করা হয়। নবীর আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসায় কোটি কোটি শিক্ষার্থী ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করে। এটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এই পোস্টে আমরা জানাবো কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ, যা কওমী শিক্ষার সঠিক ধারণা দিতে সাহায্য করবে।
কওমি মাদ্রাসার ক্লাসের নাম সমূহ
কওমি মাদ্রাসার শ্রেণি বা ক্লাসসমূহকে জামাত বলা হয়। বর্তমানে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাক্রমে দুটি সিলেবাস চালু আছে। যথা:
- দরসে নিজামী
- মাদানী নেসাব
দরসে নিজামীর সিলেবাসের কিতাবগুলো পড়তে সাধারণত অনেক সময় লাগে।
অন্যদিকে মাদানী নেসাবের সিলেবাসের কিতাবগুলো কম সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়।
বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসার বিভিন্ন শাখার মধ্যে প্রধান শাখা হলো কিতাব বিভাগ। এই বিভাগের সিলেবাস সাধারণত দশ বছরে শেষ করা হয়। শিক্ষার্থীদের এই সময়ের মধ্যে নিয়ম অনুযায়ী দশটি ক্লাসে পড়াশোনা করতে হয়। ক্লাসগুলো নিম্নরূপ:
১. ইবতেদায়িয়াহ: এটি চতুর্থ শ্রেণীর সমমানের ক্লাস। এই ক্লাসে ভর্তি হয় সেই সমস্ত ছাত্ররা যারা হিফজ শেষ করে কওমী নেসাবে পড়াশোনা করতে আগ্রহী। এই ক্লাসে শিক্ষার্থীরা সাধারণত বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও উর্দূ খুব বেশি জানে না। (কওমী মাদ্রাসায় সাধারণত বাংলা, ইংরেজি ও গণিত খুব সীমিতভাবে পড়ানো হয়।
কিছু মাদ্রাসা ইংরেজিতে সামান্য গুরুত্ব দেয়। গণিতও সিলেবাসে আছে, কিন্তু ফার্সী ও উর্দূর সঙ্গে মিশে তেমন গুরুত্ব পায় না।) এই জামাতে প্রাথমিক পড়াশোনা করানো হয়। এর আগে নূরানী মাকতাবে শিক্ষার্থীদের বাংলা, গণিত ইত্যাদি বিষয়ে অল্প পড়ানো হয় ।
২. তাইসীর/বিশেষ: এই ক্লাসটি পঞ্চম শ্রেণীর সমমানের। এখানে ভর্তি হয় হিফজ শেষ করা মেধাবী ছাত্ররা এবং যারা বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও উর্দূ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখে। এছাড়া, হিফজ না করা বহিরাগত ছাত্ররাও এখানে পড়তে পারে। এই জামাতে পড়াশোনার পরিমাণ অনেক বেশি। বিশেষ ক্লাসে ভর্তি ছাত্রদের প্রথম বছর বা ইবতেদায়ি আওয়াল পড়তে হয় না। পাশাপাশি, এই ক্লাসে পঞ্চম শ্রেণীর বোর্ড পরীক্ষাও নেওয়া হয়।
আপনি হয়তো জানেন, কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ছাড়া অন্যান্য বিষয়গুলোর শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের জন্য বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই কাজ করে আসছে। পরীক্ষার ফলাফলগুলো নিয়মিতভাবে তাদের ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত থাকে।
৩. মিজান: এই ক্লাসটি ষষ্ঠ শ্রেণীর সমমানের। এখানে তাইসীর বা বিশেষ ক্লাসের ছাত্ররা ভর্তি হয়। এই জামাতে আরবী ভাষা শুরু হয় এবং বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় আরবীর পাঠে। এই ক্লাসে বেফাকের পরীক্ষা নেওয়া হয় না, তবে শিক্ষার্থীদের প্রতি কোনো অবহেলাও করা হয় না।
৪. নাহবেমীর: এই ক্লাসটি সপ্তম শ্রেণীর সমমানের। এখানে ভর্তি হয় মিজান ক্লাস শেষ করা ছাত্ররা। এই জামাতে বেফাকের পরীক্ষা নেওয়া হয়। সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আরবী ব্যাকরণ, উর্দূ, ফার্সী, সামান্য বাংলা, ইংরেজি এবং গণিত।
৫. হেদায়েতুন্নাহু: স্কুলের ক্লাসের সঙ্গে এই জামাতের পড়াশোনার সরাসরি তুলনা করা যায় না। কারণ, এখানে ছাত্রদের অনেক বেশি পরিমাণে পড়াশোনা করতে হয়। অর্থাৎ যেখানে স্কুলের ছাত্ররা দিনে তিন ঘন্টা পড়ে, সেখানে এই শিক্ষার্থীরা ছয় ঘন্টা পড়ার পরও সব বিষয় শেষ করতে পারে না। অনেক বিষয় মুখস্ত করতে হয়, তাই প্রচুর শ্রম ব্যয় করতে হয়। তার উপর যদি মেধা কম হয়, তবে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
৬. কাফিয়া: এটি উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি ক্লাস। এই জামাতে কুরআন, হাদীস, ইসলামিক গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার কিতাব এবং আরবী সাহিত্য পড়ানো হয়। এই ক্লাসে বোর্ড পরীক্ষা নেওয়া হয় না।
৭. শরহে বেকায়া: এটি উচ্চপর্যায়ের একটি ক্লাস, যা পূর্বের ক্লাসগুলোর সঙ্গে খুব কম মিল রাখে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জামাত। এখানে কুরআনের তাফসীর, হাদিসের বিশ্লেষণ, রাসুলের জীবনী, আরবী গণিত এবং ইতিহাসের পাঠ পড়ানো হয়। এই ক্লাসে বোর্ড পরীক্ষাও নেওয়া হয়।
৮. জালালাইন: এটি শেষ পর্যায়ের একটি ক্লাস, যা দরসী যোগ্যতা অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে উচ্চমানের অনেক কিতাব পড়ানো হয়। যার মধ্যে রয়েছে তাফসীরে জালালাইন, নূরুল আনওয়ার, হেদায়া (১ম ও ২য় খণ্ড) এবং আরও অন্যান্য কিতাব। এই জামাতে বেফাক বা বোর্ড পরীক্ষা নেওয়া হয় না।
৯. মেশকাত: এই ক্লাসের শেষেই দাওরা শুরু হয়, তাই মান নিয়ে আলাদা আলোচনার প্রয়োজন নেই। সিলেবাসে রয়েছে মেশকাত শরীফ, হেদায়া (৩য় ও ৪র্থ খণ্ড), বায়যাবি, নূখবা, শরহে আকাইদ, দেওবন্দের ইতিহাস এবং আরও অনেক কিতাব। এই জামাতে বোর্ড পরীক্ষা নেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন মাদ্রাসায় মেশকাতের বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল ব্যতিত ভর্তি নেওয়া হয় না।
১০. দাওরা: দাওরাকে সম্প্রতি মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হয়েছে (যদিও এ নিয়ে কিছু ভিন্ন মত আছে)। এটি কওমী মাদ্রাসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস এবং মাওলানাদের সর্বশেষ পর্যায়। সিলেবাসে রয়েছে বুখারী, তিরমিজী, নাসায়ী এবং ইবনে মাজাহ শরীফসহ আরও অনেক কিতাব।
দরসে নিজামী ক্লাসের নাম সমূহ
| ক্রমিক নং | জামাত/ক্লাসের নাম |
| ১ | ইবতেদায়িয়াহ |
| ২ | তাইসীর জামাত / বিশেষ জামাত |
| ৩ | মিজান জামাত |
| ৪ | নাহবেমীর জামাত |
| ৫ | হেদায়েতুন্নাহু জামাত |
| ৬ | কাফিয়া জামাত |
| ৭ | শরহে জামী জামাত |
| ৮ | জামাতে শরহে বেকায়া |
| ৯ | জালালাইন জামাত |
| ১০ | মেশকাত জামাত |
| ১১ | দারুল হাদিস (মাস্টার্স ডিগ্রি) |
| ১২ | ইফতা (ফতোয়া বিভাগ) |
মাদানী নেসাবের ক্লাসের নাম সমূহ
মাদানী নেসাব মূলত একটি সাত বছরের পূর্ণাঙ্গ কোর্স। এখানে আলাদা আলাদা জামাত বা শ্রেণি নেই; বরং শিক্ষার্থীদেরকে বর্ষ অনুযায়ী পড়াশোনা করতে হয়।
| ক্রমিক নং | বর্ষের নাম |
| ১ | প্রথম বর্ষ |
| ২ | দ্বিতীয় বর্ষ |
| ৩ | তৃতীয় বর্ষ |
| ৪ | চতুর্থ বর্ষ |
| ৫ | পঞ্চম বর্ষ |
| ৬ | ষষ্ঠ বর্ষ |
| ৭ | সপ্তম বর্ষ (দাওরা হাদিস) |
| ৮ | অষ্টম বর্ষ (ইসলামিক উচ্চতর আইন বিভাগ) |

